বাংলাদেশ বিমান বাহিনী





বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আকাশ যুদ্ধ শাখা। বিমান বাহিনীর প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশের আকাশ সীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। পাশাপাশি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বিমান সহায়তা প্রদান করাও বিমান বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়াও বিমান বাহিনী দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত রয়েছে।

ইতিহাস
২০১৬ সালের বিজয় দিবসে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শনরত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এফ-৭ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান
১৯৭১ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা ওতপ্ৰোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং স্থল যুদ্ধের প্ৰস্তুতি ও পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের জুলাইয়ে সেক্টর অধিনায়কদের সম্মেলনের সময় বিমান বাহিনী গঠন নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয় নি। কারণ সেই সময় তা সম্ভবপর এবং যুক্তি সংগত ছিলনা। ফলে আনুষ্ঠানিক কোন সিদ্ধান্তে পৌছায়নি প্ৰবাসী সরকার। কিন্ত যুদ্ধের শুরু থেকেই বেশ কিছু বিমান বাহিনীর কৰ্মকৰ্তা ও সদস্য সক্ৰিয় ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার ও স্কোয়াড্ৰন লিডার এম হামিদুল্লাহ্ খান ছিলেন যথাক্রমে ৬ ও ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক। এছাড়াও জেড ফোৰ্সে আশরাফ, রউফ, লিয়াকত প্ৰমুখও যুদ্ধ ময়দানে বিভিন্ন গুরুত্বপূৰ্ণ পদে দায়িত্বরত ছিলেন।  অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের ডিমাপুরে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। শুরুতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জনবল ছিলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পক্ষত্যাগী বাঙালি কর্মকর্তা ও বিমানসেনারা। সে সময় ভারতে আশ্ৰয় নিয়ে যুদ্ধ সমাপ্ত পৰ্যন্ত থেকে যাওয়া বেশ কিছু বিমান কৰ্মকৰ্তা ছিলেন; যেমন বদরুল আলম, এ কে খন্দকার, সুলতান মাহমুদ, পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ, সাবেক পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সাত্তার, সাবেক পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিন এবং সাবেক কৃষিবিভাগের পাইলট ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ প্রমুখ। তাঁদের মধ্যে বিশেষ করে ২/৩ জনের দাবি অনুযায়ী "বাংলাদেশ বিমান বাহিনী" নাম করণ করা হয় এবং তাঁদের প্ৰশিক্ষণ দেয়া হয়। মূলত তাঁরাই ভারত থেকে তাঁরাই বাংলাদেশে উড়ে এসে বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযান চালান। এই অপারেশন তাঁরাই কিলো ফ্লাইট নাম দেন। ভারত উপহার হিসেবে কিলো ফ্লাইটের সাফল্যর জন্য ছোট তিনটি পুরাতন বিমান দেয় - একটি ডাকোটা ডিসি-৩ পরিবহন বিমান, একটি ডি.এইচ.সি-৩ টুইন অটার পর্যবেক্ষণ বিমান ও একটি ঔষধ নিক্ষেপের কাজে ব্যবহৃত অ্যালুয়েট থ্রি হেলিকপ্টার।  ডিমাপুরের একটি পরিত্যক্ত রানওয়েতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর টেকনিশিয়ানরা উপহার পাওয়া বিমানগুলো রূপান্তর ও আক্রমণ উপযোগী করে তোলার কাজ শুরু করেন। ডাকোটা বিমানটিকে ৫০০ পাউন্ড বোমা বহনের উপযোগী করে তোলা হয়। টুইন অটারটির প্রতি পাখার নিচে ৭টি করে রকেট যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি এটি ১০টি ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমাও বহন করতে পারত যা একটি দরজা দিয়ে হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হত। আর অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারের সামনে একটি .৩০৩ ব্রাউনিং মেশিন গান এবং দুই পাইলন থেকে ১৪টি রকেট নিক্ষেপের ব্যবস্থা করা হয়। এই ছোট বাহিনীকে কিলো ফ্লাইট নামকরণ করা হয়। স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদকে কিলো ফ্লাইটের অধিনায়ক নির্বাচিত করা হয়।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিমান বাহিনী অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে। ওইদিন ক্যাপ্টেন আকরাম কর্তৃক পরিচালিত আক্রমণে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল ডিপো ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিমান বাহিনী মৌলভীবাজারে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যারাকে হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পাকিস্তানিদের ঘাঁটিতে অনেকগুলো আক্রমণ পরিচালনা করে। 

১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল থেকে সরকারি ঘোষণায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯৭১ পরবর্তী: বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিকাশ

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী যাদুঘরে একটি এফ-৮৬ স্যাবর যুদ্ধবিমান

বিমান বাহিনীর দুইজন নারী বৈমানিক
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত অনেক বাংলাদেশী কর্মকর্তা ও বিমান সেনা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। যার ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সূচনালগ্নেই এক দল প্রশিক্ষিত জনবল পেয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৩~৭৪ সালে পাকিস্তান ফেরত জনবল বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমাবর্ষণের ফলে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বহু বিমান মিয়ানমার হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। ভূমিতে আটকা পরা বিমান ভারত নিয়ে যায়। আত্মসমর্পণের পরে পাকিস্তানি বাহিনীর এসব বিমানের বেশিরভাগই ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত বিমান রয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রযুক্তিবিদরা কিছু বিমানকে মেরামত করে উড্ডয়ন সক্ষম করে তোলে। স্বাধীনতার পর বিমান বাহিনী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বড় ধরনের অনুদান পায় যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১০টি মিগ-২১এমএফ এবং ২টি মিগ-২১ইউএম যুদ্ধ বিমান।

You have to wait 70 seconds.







১৯৭৭ সালে জাপান এয়ারলাইন্স ভারত থেকে ঢাকায় হাইজ্যাক হওয়ার ঘটনাৱ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়। যেটা দমনে অনেক কর্মকর্তা ও বিমানসেনা নিহত হয়। বিদ্রোহ পরবর্তী বিচারে আরও বহু সংখ্যক কর্মকর্তা ও বিমানসেনার মৃত্যুদণ্ড হয় যার ফলে বিমান বাহিনীর জনবল ভয়াবহ হ্রাস পায়। বিদ্রোহ পরবর্তী বিমান বাহিনীতে জনবল সংকটে দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে যা একটি সদ্যসৃষ্ট বিমান বাহিনীর বিকাশে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করে।

উড্ডয়নের পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মিগ-২৯বি যুদ্ধ বিমান
জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এর শাসনামলে পাকিস্তানের সাথে সামরিক সহযোগিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। যার ফলস্বরূপ ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান কয়েক স্কোয়াড্রন এফ-৬ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে উপহার হিসেবে প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী রাশিয়া থেকে ৮টি চতুর্থ প্রজন্মের মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে।

২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমিকে জাতীয় পতাকা প্রদান করা হয়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।
ফোর্সেস গোল ২০৩০

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ইয়াক-১৩০ বিমান
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বর্তমানে ফোর্সেস গোল ২০৩০ নামক একটি উচ্চাভিলাষী আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠছে। এই পরিকল্পনার অধীনে বিমান সক্ষমতা এবং ভূমি-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুইটিই শক্তিশালিতা করা হচ্ছে। ২০১১ সালে কক্সবাজারে নতুন বিমান ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটি। ঘাঁটি প্রতিরক্ষা ও পাইলট উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে বিশেষায়িত ইউনিট স্কোয়াড্রন ৪১।

২০১০ সাল থেকে বিমান বাহিনীতে ১৬টি এফ-৭বিজিআই যুদ্ধ বিমান, ১৬ টি উচ্চতর জেট প্রশিক্ষণ বিমান, ৯টি কে-৮ প্রাথমিক জেট প্রশিক্ষণ বিমান, ৩টি এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান এবং ২৩টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে আরও যুক্ত হয়েছে ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ যুদ্ধ হেলিকপ্টার, ২টি এডব্লিউ-১৩৯ সামুদ্রিক উদ্ধার ও অনুসন্ধান হেলিকপ্টার এবং ২টি এডব্লিউ-১১৯কেএক্স প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার।
২০১১ সালে এফএম-৯০ স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের মধ্য দিয়ে বিমান বাহিনী ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করে। এখন পর্যন্ত বিমান বাহিনী দুই রেজিমেন্ট এই ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করেছে। ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে জেওয়াই-১১বি, জেএইচ-১৬, ওয়াইএলসি-৬ এবং ওয়াইএলসি-২ রাডার ব্যবস্থা।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অফিসার ও বিমানসেনা মিলিয়ে ৬০০ এর অধিক জনবল, ১২টি হেলিকপ্টার ও ১টি পরিবহন বিমান বর্তমানে জাতিসংঘ মিশনে মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে হাইতিতে ৩টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার, মালিতে ৩টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার এবং কঙ্গোতে ৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার ও ১টি সি-১৩০বি পরিবহন বিমান মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া লাইবেরিয়া, আইভরি কোস্ট প্রভৃতি দেশেও বিমান বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট মোতায়েন রয়েছে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে নারী
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে প্রথমবারের মতো ৬৪ জন নারী বিমানসেনা হিসেবে প্রাথমিক রিক্রুট প্রশিক্ষণ শেষ করে।পুরুষদের মতো নারীদেরকে বিমানসেনা হিসেবে সকল ট্রেডে নেওয়া হয়না; নারীদেরকে টেকনিক্যাল ট্রেডে, প্রভোস্ট, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, মিউজিক ট্রেড এবং ফিজিক্যাল ফিটনেস অ্যান্ড ড্রিল ইন্সট্রাক্টর (পিএফঅ্যান্ডডিআই) ট্রেডে নেওয়া হয়। নারীরা কর্মকর্তা হিসেবে ২০০০-এর দশক থেকেই যোগ দিতে পারেন তবে তাদের বৈমানিক হওয়ার অনুমতি ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত ছিলোনা, ২০১৪ সালে দুইজন নারী কর্মকর্তা বৈমানিক হওয়ার প্রশিক্ষণ অর্জন করেন।


 

Comments