ছেলেবেলা

 


    


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বয়স তখন ছিল কাঁচা— হাল্কা দেহখানা
ছিল পাখির মতাে, শুধু ছিল না তার ডানা।
উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলাের ঝাঁক,
বারান্দাটার রেলিঙ-’পরে ডাকত এসে কাক।
ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ও পার থেকে
তপসি মাছের ঝুড়িখানা গামছা দিয়ে ঢেকে।
বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের ’পরে দাদা,
সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হ’ত তাঁর সাধা।
জুটেছি বউদিদির কাছে ইংরেজি-পাঠ ছেড়ে,
মুখখানিতে ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লাল-পেড়ে।
চুরি করে চাবির গােছা লুকিয়ে ফুলের টবে
স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে।
কিশােরী চাটুজ্জে হঠাৎ জুটত সন্ধ্যা হলে—
বাঁ হাতে তার থেলাে হুঁকো, চাদর কাঁধে ঝােলে।
দ্রুত লয়ে আউড়ে যেত লবকুশের ছড়া—
থাক্‌ত আমার খাতা লেখা, প’ড়ে থাকত পড়া;
মনে মনে ইচ্ছা হ’ত, যদি কোনাে ছলে
ভর্‌তি হওয়া সহজ হ’ত এই পাঁচালির দলে,
ভাব্‌না মাথায় চাপত নাকো ক্লাসে ওঠার দায়ে,
গান শুনিয়ে চলে যেতুম নতুন নতুন গাঁয়ে।

You have to wait 80 seconds.





স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে
হঠাৎ দেখি, মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, রাস্তা ভাসে জলে—
ঐরাবতের শুঁড় দেখা দেয় জল-ঢালা সব নলে।
অন্ধকারে শােনা যেত রিম্‌ঝিমিনি ধারা,
রাজপুত্র তেপান্তরে কোথা সে পথ-হারা।
ম্যাপে যে-সব পাহাড় জানি, জানি যে-সব গাঙ,
কুয়েন্‌লুন আর মিসিসিপি ইয়াংসিকিয়াঙ—
জানার সঙ্গে আধেক জানা, দূরের থেকে শােনা,
নানা রঙের নানা সুতােয় সব দিয়ে জাল-বােনা,
নানারকম ধ্বনির সঙ্গে নানান চলাফেরা,
সব দিয়ে এক হাল্কা জগৎ মন দিয়ে মাের ঘেরা,
ভাব্‌নাগুলাে তারই মধ্যে ফিরত থাকি থাকি—
বানের জলে শ্যাওলা যেমন, মেঘের তলে পাখি।

Comments